ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বিরামপুর উপজেলা - বিরামপুর নিউজ

Tuesday, January 9, 2018

ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বিরামপুর উপজেলা

বিরামপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চলে ছোট যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ব্যবসা সমৃদ্ধ থানা বিরামপুর বর্তমান লোকসংখ্যা ১৬৮৭৬৮ জন। জেলা কেন্দ্র হতে এ স্থানের দূরত্ব ৫৬ কিঃ মিঃ এবং জেলার দক্ষিণ-পূর্ব শেষ প্রান্ত বিরামপুর হতে মাত্র ৪০ কিঃ মিঃ। প্রতীয়মান হয় যে, জেলার দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলাসমূহের কেন্দ্রস্থল বিরামপুর।
আদিকথা : ক্রেতাযুগে মহাকবি বাল্মিকী বিরামপুরের অদূরে তর্পূন ঘাট নামক স্থানে আশ্রয় বেঁধে পূজাপার্বনাদির কার্য সম্পাদন করতেন। ঠিক তারই সন্নিকটে বিরামপুর-নবাবগঞ্জ সড়কের পাশে সীতাকোট নামক স্থানে একটা ইষ্টক স্তূপের উপর সীতার পদচিহ্ন দুষ্ট হয়। এতে অনেকের অনুমান রাম কর্তৃক সীতা অল্প দিন হলেও এ স্থানে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। পরবর্তীতে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল বিরামপুর। দিনাজপুর গেজেটিয়ারে পাওয়া যায় তার এ রাজধানীকে শক্রর হাত হতে রক্ষা করার জন্য পার্বতীপুর থানার গাবড়া গ্রামে একটা দূর্গ এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত রক্ষার্থে ঘোড়াঘাটে আর একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। বিরামপুর ঘোড়াঘাট  সড়ক ঐ সময়ে নির্মিত বলে অনেকের ধারণা।
মিঃ নেট নামে একজন পশ্চিমা ঐতিহাসিকের মতে দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাংশে মহাস্থানের রাজা পরশুরাম (তখন মহাস্থান দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল) ঐ স্থান হতে আনুমানিক ২২ জন অধিনস্ত রাজা তার তাঁবেদার রাজা হিসাবে নিয়োগ করে। তখন রাজা পাথরদাস বিরামপুরে তাবেদার রাজা হিসেবে শাসন কর্মে বহাল ছিলেন। এ সময় বিরামপুরের সীমানা ছিল উত্তরে বর্তমান পল¬ী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস হতে দক্ষিণে জামালেশ্বর শিব মন্দির পর্যন্ত। চীন পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বিবরণীতে জানা যায়, খ্রীষ্টপূর্ব ৩য় অব্দ হতে ৭ম খৃষ্টাব্দ পর্ষন্ত এ অঞ্চলের সকল শাসকগণই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। এ সময় একজন মুসলমান পীরশাহ সুলতান হজরত আউলিয়া কর্তৃক এই মহাস্থান গড় বিজিত হলে পাল শাসনের অবসাণ ঘটে। ৮৮৮ খৃষ্টাব্দে বানরাজা নামে বর্তমান পশ্চিম দিনাজপুর রামগড়ের হিন্দু রাজা এ অঞ্চল দখল করেন। ইনি শিবের ভক্ত ছিলেন বলে তাকে বানাসুর বলা হত। দিনাজপুর জেলার ইতিহাস লেখক মেহরাব আলীর ও সৈয়দ মোশাররফ হোসেনের মতে দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চলের থানাসমূহের কেন্দ্রস্থল বিরামপুর ডিগ্রী কলেজের অদূর দক্ষিণে জামালেশ্বর ম-বে একটা শিব মন্দির স্থাপিত করেন এবং ইহাই অত্রাঞ্চালের একমাত্র প্রাচীন শিবমন্দির বলে শিব পুজকদের ধারণা।
দিনাজপুর গেজেটিয়ারে পাওয়া যায়, তখন এ স্থানের নাম ছিল ভোলাগঞ্জ। ৯৯৭-১০০৩ খৃষ্টাব্দে পর্যন্ত গজণীর সুলতান মাহমুদ ভারত বর্ষ অভিযান আরম্ভ করলে উত্তর ভারতের শাসকগণ এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। ঠিক এ সময়ই দিনাজপুর এবং ভাদুরিয়া অঞ্চলে পাল বংশের শেষ পরাক্রমশালী শাসক মহীপালের (৯৮০-১০০৩) সহিত কৈবর্ত্য বংশোদ্ভুত দিবেকাক নামক এ ব্যক্তিকে তাদের অধিনায়ক করে কৈবর্ত্যগণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে জয়লাভ করে ঘোড়াঘাট তার রাজধানী স্থাপন করেন এবং রাজধানী রক্ষার্থে ইহার চতুর পার্শ্বে পরীখা খনন করেন।
কৈবর্ত্যরাজ দিপাক শিবের পূজা করতেন কি না এটা আমাদের নিকট অজ্ঞাত তবে প্রতি বছর জামালেশ্বর (ভালাগঞ্জ) শিব মন্দিরে আজও বহু দূর-দূরান্ত থেকে কৈবর্ত্য পলিলায়সহ সর্বস্তরের হিন্দু ধর্মাবলন্বী এ শিব মন্দিরে পূজা উপলক্ষে আসেন এবং শিব মন্দিরে অর্ঘ দিয়ে থাকেন। এ সময় হতেই বিরামপুর পরিচিতি লাভ করতে থাকে।
পরবর্তীকালে অত্রাঞ্চলে পুনরায় পালবংশ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় কিন্তু এ বংশের সর্বশেষ শাসনকর্তা মদনপালকে ধ্বংস করে তার সেনাপতি ঈতুসেন নদীয়া জয় করে সেন বংশ প্রতিষ্ঠিত করেন। ১২০১ খৃস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী লক্ষণ সেন কে বিতাড়িত করে নদীয়া জয় করে উত্তর বঙ্গের দিনাজপুর জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের বৃহত্তম এলাকায় তার শাসন কেন্দ্র বা রাজধানী করেন। মালিক ইখতিয়ার উদ্দীনের উদ্দেশ্য ছিল এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও রাজ্য বিস্তার ।
সুতরাং প্রথা অনুযায়ী তার নিজ নামে এখানে একটা মসজিদ নির্মাণ করেন। কৈবর্ত্য, পলিয়া, দ্রাবিড় বংশো™ু¢ত নি¤œ শ্রেণীর হিন্দুদের উপর ব্রাহ্মণ্যবাদের বিমাতাসুলভ আচরণ ইখতিয়ার উদ্দিনকে ভাবিয়ে তুললে তিনি আরও পূর্ব থেকে অগ্রসর হন এবং অনুমান করা হয় তারই ভ্রাতা এবং সেনাপতি আজ্জুদ্দিনকে বালুরঘাটের পূর্বাঞ্চলের জাইগীর প্রদান করেন। কিন্তু আট মাসের মাথায় আলিম উদ্দিন খিলজী নামক জনৈক সামন্ত তাকে নিহত করেন। আলিম উদ্দিন খিলজী কর্তৃক আনুমানিক ১২০৩ খৃস্টাব্দে বিরামপুর বাজারের মধ্যবর্তী স্থান আসন তলীতে একটা মসজিদ নির্মাণ করেন। আজ  হতে মাত্র ২০ বছর আগেও এ মসজিদের ধ্বংসাবশেষের উপর একটা বৃহৎ বটগাছ ছিল।
কালস্রোতে গড়ে উঠেছে আজ সেখানে আর একটা নতুন মসজিদ । অতীতের স্বাক্ষর মুছে গেছে রইল শুধু ইতিহাস। রাজা বিরাট ও রাজা পতির দাসের পর বিরামপুরে কোন প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিলনা। তা ছাড়া বিরামপুরের সকল পার্শ্ববর্তী এলাকা ভোলাগঞ্জ নামেই পরিচিত ছিল বলে প্রতিয়মান হয় এবং গিলাবাটা পরগনা নামে বিশেষ পরিচিত ছিল।
১২০৬ খৃঃ হতে বিরামপুরে কোন সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে ১৩৪২ খৃঃ হতে ১৫৩৮ খৃঃ পর্ষন্ত বাংলায় ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী বংশের স্বাধীন শাসনামলে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটলে বিরামপুরের পশ্চিমে প্রস্তমপুর গ্রামের সন্নিকটে সোটাপীর নামে জনৈক আউলিয়ার আগমন ঘটে। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন এবং দীন ইসলাম প্রচারে প্রাণ উৎসর্গ করেন ফলে ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদ অত্রাঞ্চলে দৃঢ় হয়।
মোঘল সম্রাট আকবর বৈরামখানের অভিভাবকত্বে ১৫৫৬ খৃঃ পানিপথের ২য় যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল¬ীর অধিপতি হন। বালেগ হয়ে বৈরামখানের অভিভাবকত্ব ছিন্ন করে মহামতি আকবর ১৫৭৬ খৃঃ কররানীকে পরাভুত করে বাংলা জয় করেন। বিষ্ণদত্তকে কান্নগো রুপে দিনাজপরের রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের বন্দোবস্তের জন্যই তাকে প্রেরণ করেন।
বিষ্ণু বৈরামখানের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে এ ভক্ত বিষ্ণুদত্তই বৈরামখানের নামানুসারে ভোলাগঞ্জ নাম পরিবর্তন করে এ স্থানের নাম রাখেন বিরামপুর। বিরামপুরের ইহাই আদি ইতিবৃত্ত বলে আমাদের অনেকেই ধারণা করেন।

No comments:

Post a Comment